Surah Al Baqarah Tafseer
Tafseer of Al-Baqarah : 3
Saheeh International
Who believe in the unseen, establish prayer, and spend out of what We have provided for them,
Ibn Kathir Partial
Tafseer 'Ibn Kathir Partial' (BN)
ঈমান কি?
আবূ জা‘ফর আর রাযী (রহঃ) বলেনঃ ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেছেন যে, সত্য বলে স্বীকার করাকে ঈমান বলে। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-ও বলেন তারা ইমান আনার অর্থ হলো তারা সত্যায়ন করে। যুহরী (রহঃ) বলেন যে, ‘আমলকে ঈমান বলা হয়। রাবী‘ ইবনু আনাস (রহঃ) বলেন যে, ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে ‘অন্তরে মহান আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা।’ (তাফসীর তাবারী ১/২৩৫) ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কে উত্তম কথা হলো এই যে, তারা মুখের দ্বারা, অন্তর দ্বারা ও ‘আমল দ্বারা অদৃশ্যের ওপর ঈমান আনয়নের মাধ্যমে বৈশিষ্টমাণ্ডিত হওয়া। অবশ্য মহান আল্লাহর ভয়ও ইমান এর অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে।’ যা মূলত ‘আমলের মাধ্যমে কথার স্বীকৃতি দেয়া। ‘ঈমান’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক যা মহান আল্লাহর ওপর, তাঁর কিতাবসমূহের ওপর এবং তাঁর রাসূলগণের (আঃ) ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ও কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বীকৃতিকে সত্যায়ন করা।
আমি বলি যে, আভিধানিক অর্থে শুধু সত্য বলে স্বীকার করাকেই ঈমান বলে। কুর’আন মাজীদেও এ অর্থের ব্যবহার এসেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴿یُؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَ یُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِیْنَ﴾
সে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে আর মু’মিনদের বিশ্বাস করে। (৯ নং সূরাহ্ তাওবাহ, আয়াত নং ৬১)
ইউসুফ (রাঃ)-এর ভাইয়েরা তাদের পিতাকে বলেছিলোঃ
﴿وَ مَاۤ اَنْتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَ لَوْ كُنَّا صٰدِقِیْنَ﴾
কিন্তু আপনি তো আমাদের বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী। (১২ নং সূরাহ্ ইউসুফ, আয়াত নং ১৭) অনুরূপভাবে যখন তা ‘আমলের সাথে যুক্ত হয়ে আসবে তখনও ঈমান অর্থ সত্য বলে স্বীকার করা।
﴿اِلَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ﴾
কিন্তু তাদের নয়, যারা মু’মিন ও সৎ কর্মপরায়ণ। (৯৫ নং সূরাহ্ ত্বীন, আয়াত নং ৬)
কিন্তু যখন এটা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হবে তখন এর দ্বারা শার‘ঈ ঈমানই উদ্দেশ্য যা দৃঢ় বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও কাজে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়। অধিকাংশ ইমামগণ এরূপ মত পোষণ করে থাকেন। (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম, ১/৩৫) বরং ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ), ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ), ইমাম আবূ ‘উবাইদাহ (রহঃ) প্রভৃতি ইমামগণ একমত হয়ে বর্ণনা করেছেন যে, মুখে উচ্চারণ করা ও কার্যসাধন করার নাম হচ্ছে ঈমান এবং ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। বহু হাদীসে এর প্রমাণ আছে যা সহীহুল বুখারীর শরাহর প্রথমাংশে বর্ণনা করেছি। সমস্ত প্রশংসা ও অনুগ্রহ মহান আল্লাহরই।
কেউ কেউ ঈমানের অর্থ করেছেন ‘মহান আল্লাহর ভয়।’ যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿اِنَّ الَّذِیْنَ یَخْشََ رَبَّهُمْ بِالْغَیْبِ﴾
নিশ্চয়ই যারা তাদের প্রভুকে না দেখেই ভয় করবে। (৬৭ নং সূরাহ্ মূল্ক, আয়াত নং ১২)
অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ ﴿مَنْ خَشِیَ الرَّحْمٰنَ بِالْغَیْبِ وَ جَآءَ بِقَلْبٍ مُّنِیْبِ﴾
যারা না দেখেই দয়াময় মহান আল্লাহর ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয়। (৫০ নং সূরাহ্ কাফ, আয়াত নং ৩৩) প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহর ভয়ই হচ্ছে ঈমান ও ‘ইল্মের সারাংশ।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ﴿اِنَّمَا یَخْشَى اللّٰهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُا﴾
মহান আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই তাঁকে ভয় করে। (৩৫ নং সূরাহ্ ফাতির, আয়াত নং ২৮)
কেউ কেউ বলেন, তারা বাহ্যিকভাবে ঈমান আনার ন্যায় অদৃশ্যের প্রতিও ঈমান আনে। তারা কখনোই ঐ মুনাফিকদের ন্যায় নয়, যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿وَاِذَا لَقُوا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا قَالُوْۤا اٰمَنَّا١ۖۚ وَ اِذَا خَلَوْا اِلٰى شَیٰطِیْنِهِمْ١ۙ قَالُوْۤا اِنَّا مَعَكُمْ١ۙ اِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِءُوْنَ﴾
যখন তারা মু’মিনদের সংস্পর্শে আসে তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন তারা নিভৃতে তাদের শায়তানদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, ‘আমরা তোমাদের সাথেই আছি, আমরা শুধু তাদের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করি মাত্র’। (২ নং সূরাহ্ আল বাকারাহ, আয়াত নং ১৪) মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেনঃ
﴿اِذَا جَآءَكَ الْمُنٰفِقُوْنَ قَالُوْا نَشْهَدُ اِنَّكَ لَرَسُوْلُ اللّٰهِ١ۘ وَ اللّٰهُ یَعْلَمُ اِنَّكَ لَرَسُوْلُه وَاللّٰهُ یَشْهَدُ اِنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ لَكٰذِبُوْنَ﴾
মুনাফিকেরা যখন তোমার কাছে আসে তখন তারা বলে- ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি অবশ্যই মহান আল্লাহ্র রাসূল।’ মহান আল্লাহ জানেন, অবশ্যই তুমি তাঁর রাসূল। আর মহান আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকেরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। (৬৩ নং সূরাহ আল মুনাফিকূন, আয়াত-১)
এই অর্থ হিসেবে بالغيب শব্দটি حال হবে, অর্থাৎ তারা ঈমান আনয়ন করে এমন অবস্থায় যে, মানুষ হতে তা গোপন থাকে।
‘গাইব’ বলতে কি বুঝায়
غَيْب শব্দটির অর্থ সম্বন্ধে মুফাস্সিরগণের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ঐ সবগুলোই সঠিক এবং সব অর্থই উদ্দেশ্য পূর্ণ। আবূ জা‘ফর আর রাযী (রহঃ) আবুল ‘আলিয়া (রহঃ) থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহর ওপর, ফিরিশতাগণের ওপর, কিতাবসমূহের ওপর, কিয়ামতের ওপর, জান্নাতের ওপর, জাহান্নামের ওপর, মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের ওপর এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। কাতাদাহ ইবনু দিয়ামাহ (রহঃ)-এরও এটাই অভিমত। (তাফসীর তাবারী ১/২৩৬)
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ), ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) সহ একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, গাইব দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, জান্নাত ও জাহান্নামের ঐ সমস্ত বিষয়াদী যা কুর’আনে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু বান্দার নিকট অদৃশ্যমান।
মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক (রহঃ) ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর একটি মত উল্লেখ করেছেন যে, মহান আল্লাহ কর্তৃক যা কিছু এসেছে তার সবই গাইব দ্বারা উদ্দেশ্য। আর সুফইয়ান সাওরী (রহঃ) একটি বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন, গাইব দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল কুর‘আন।
একবার ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ)-এর মাজলিসে সাহাবীগণের গুণাবলীর আলোচনা চলছিলো। তিনি বলেনঃ যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখেছেন তাদের তো কর্তব্যই হলো তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা; কিন্তু মহান আল্লাহর শপথ! ঈমানী মর্যাদার দিক দিয়ে তারাই উত্তম যারা না দেখেই তাঁকে বিশ্বাস করে থাকেন। তারপর তিনি ﴿الٓمّٓۚ ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَیْبَ١ۛۖۚ فِیْهِ١ۛۚ هُدًى لِّلْمُتَّقِیْنَۙ الَّذِیْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِالْغَیْبِ﴾ পর্যন্ত পাঠ করলেন।’ (মুসনাদ ইবনু আবী হাতিম ১/৩৪, মুসতাদরাক হাকিম ২/২৬০) ইমাম হাকিম এই বর্ণনাটিকে সঠিক বলে থাকেন। মুসনাদ আহমাদেও এ বিষয়ের একটি হাদীস আছে। ইবনু মুহাইরীজ (রহঃ) আবূ জুমু‘আহ (রাঃ) নামক সাহাবীকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘এমন একটি হাদীস আমাকে শুনিয়ে দিন যা আপনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে শুনেছেন। তিনি বলেনঃ ‘আচ্ছা, আমি আপনাকে খুবই ভালো একটা হাদীস শুনাচ্ছি। একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে নাশ্তা করছিলাম। আমাদের সাথে আবূ ‘উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ্ (রাঃ)-ও ছিলেন। তিনি বলেনঃ ‘হে মহান আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!
هَلْ أَحَدٌ خَيْرٌ مِنَّا أَسْلَمْنَا مَعَكَ وَجَاهَدْنَا مَعَكَ قَالَ نَعَمْ قَوْمٌ يَكُونُونَ مِنْ بَعْدِكُمْ يُؤْمِنُونَ بِي وَلَمْ يَرَوْنِي.
‘আমাদের চেয়েও উত্তম আর কেউ আছে কি? আমরা আপনার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি, আপনার সাথে ধর্ম যুদ্ধে অংশ নিয়েছি।’ তিনি বললেনঃ ‘হ্যাঁ, আছে। ঐ সমুদয় লোক তোমাদের চেয়ে উত্তম যারা তোমাদের পরে আসবে এবং আমার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে অথচ তারা আমাকে দেখতেও পাবে না।’ (হাদীস সহীহ। মুসনাদ আহমাদ ৪/১০৬, ১৬৯৭৬)
তাফসীর ইবনু মিরদুওয়াই এ রয়েছে সালিহ ইবনু যুবাইর (রহঃ) বলেনঃ আবূ জুমু‘আহ আনসারী (রাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসে আমাদের নিকট আগমন করেন। রিযা ইবনু হাইআহ্ (রাঃ)-ও আমাদের সাথে ছিলেন। তিনি ফিরে যেতে থাকলে আমরা তাঁকে পৌঁছে দেয়ার জন্য তাঁর সাথে সাথে চলি। তিনি আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় বলেনঃ ‘আপনাদের এই অনুগ্রহের প্রতিদান ও হক আমার আদায় করা উচিত। শুনে রাখুন! আমি আপনাদেরকে এমন একটা হাদীস শুনাবো যা আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে শুনেছি।’ আমরা বলিঃ ‘মহান আল্লাহ আপনার ওপর দয়া করুন! আমাদের তা অবশ্যই বলুন।’ তিনি বললেনঃ ‘শুনুন! আমরা দশজন লোক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-ও ছিলেন। আমরা বললামঃ ‘হে মহান আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমাদের চেয়েও কি বড় সাওয়াবের অধিকারী আর কেউ হবে? আমরা মহান আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার সাথে জিহাদ করছি। তিনি বললেনঃ
مَا يَمْنَعُكُمْ مِنْ ذَلِكَ وَرَسُوْلُ اللهِ بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ يَأْتِيْكُمْ بِالْوَحْيِ مِنَ السَّمَاءِ، بَلْ قَوْمٌ مَنْ بَعْدَكُمْ يَأْتِيْهِمْ كِتَابٌ بَيْنَ لَوْحَيْنِ يُؤْمِنُوْنَ بِهِ وَيَعْمَلُوْنَ بِمَا فِيْهِ، أُولَئِكَ أَعْظَمُ مِنْكُمْ أَجْرًا" مَرَّتَيْنِ.
‘তোমরা কেন করবে না? মহান আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো স্বয়ং তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছেন। আকাশ থেকে মহান আল্লাহর ওয়াহী তোমাদের সামনেই বার বার অবতীর্ণ হচ্ছে। ঈমান তো ঐ সব লোকের যারা তোমাদের পরে আসবে, তারা দুই জিলদের মধ্যে কিতাব পাবে এবং তার ওপরই ঈমান এনে ‘আমল করবে। তারাই তোমাদের দ্বিগুণ সাওয়াবের অধিকারী।’ (ইবনু আসাকীর ৬/৩৬৮) এই হাদীসটি তাদের প্রার্থনা কবুল হওয়ার দালীল যাতে হাদীস বিশারদগণের মাঝে মতভেদ বিদ্যমান। যেমনটি আমি সহীহুল বুখারীর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছি। কেননা পরবর্তীদের প্রশংসা এর ওপরে ভিত্তি করেই হচ্ছে এবং এই হিসেবেই তাদেরকে বড় পুণ্যের অধিকারী বলা হয়েছে। নতুবা সাধারণভাবে তো সাহাবীগণই (রাঃ) প্রত্যেক দিক দিয়েই উত্তম। আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করলেনঃ
"أي الخلق أعجب إليكم إيمانا؟". قالوا: الملائكة. قال: "وما لهم لا يؤمنون وهم عند ربهم؟". قالوا: فالنبيون. قال: "وما لهم لا يؤمنون والوحي ينزل عليهم؟". قالوا: فنحن. قال: "وما لكم لا تؤمنون وأنا بين أظهركم؟". قال: فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: "ألا إن أعجب الخلق إليّ إيمانا لَقَوْمٌ يكونون من بعدكم يَجدونَ صحفا فيها كتاب يؤمنون بما فيها"
তোমাদের মাঝে ঈমানের দিক থেকে সর্বোত্তম কে? তারা বললো ফিরিশতাগণ। তিনি বলেন, তারা কেন ঈমান আনবে না? তারা তো প্রভুর নিকটেই আছে। সাহাবীগণ বললেন, তারপর নবীগণ। তিনি বলেন, তারা ঈমান আনবে না কেন? তাদের ওপর তো ওয়াহী অবতীর্ণ হয়ে থাকে। সাহাবীগণ বললেন, তাহলে আমরা। তিনি বলেন, তোমরা কেন ঈমান আনবে না অথচ স্বয়ং আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান। তবে আমার মতে সর্বোত্তম ঈমানদার তারাই যারা তোমাদের পরে আসবে তারা কিছু কিতাব সম্বলিত সহীফা পাবে এবং তার ওপরই তারা ঈমান আনবে। (আল ইসাবা, মুসতাদরাক হাকিম ৪/৮৫, ইমাম হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। হাদীসটি ইমাম বুখারী স্বীয় তারীখের মধ্যে (২/৩১১) উল্লেখ করেছেন) এর সনদে মুগীরাহ ইবনু কায়িস রয়েছে যাকে আবূ হাতিম আর রাযী মুনকারুল হাদীস বলে আখ্যা দিয়েছেন। অবশ্য অনুরূপ একটি হাদীস দুর্বল সনদে মুসনাদ আবূ ইয়া‘লা তাফসীরে ইবনু মারদুওয়াই এবং মুসতাদরাক হাকিমের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। আর হাকিম তাকে সহীহও বলেছেন। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতেও মারফূ‘ সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবে সঠিক বিষয়ে মহান আল্লাহই ভালো জানেন।
মুসনাদ ইবনু আবী হাতিম বুদাইলা বিনতে আসলাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন একবার আমরা বানূ হারিসার মাসজিদে যোহর বা ‘আসরের সালাতে ছিলাম এবং আমাদের চেহারা তখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ছিলো। দু’রাকা‘আত পড়া হলে কোন একজন এসে সংবাদ দিলো যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বায়তুল্লার দিকে মুখ করেছেন। এ সংবাদ শোনা মাত্রই আমরা বায়তুল্লার দিকে চেহারা ঘুরে নিলাম। স্ত্রী লোকেরা পুরুষদের জায়গায় চলে আসলো আর পুরুষ লোকেরা স্ত্রী লোকদের জায়গায় চলে গেলো। আর এভাবেই বাকী দু’রাকা‘আত আমরা বায়তুল্লার দিকে চেহারা করেই আদায় করলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বললেন, এসব লোক তারাই যারা অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস করে থাকে। এই সনদে এই হাদীসটি গারীব।
﴿وَیُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ﴾
আর সালাত প্রতিষ্ঠিত করে ও আমি তাদেরকে যে জীবিকা প্রদান করেছি তা থেকে দান করে থাকে। (২ নং সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্, আয়াত নং ৪)
‘ইকামতে সালাত’ এর অর্থ
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘তারা ফরয সালাত আদায় করে, রুকূ‘-সাজদাহ, তিলাওয়াত, নম্রতা এবং মনোযোগ প্রতিষ্ঠিত করে।’ (তাফসীর তাবারী ১/২৪১)
কাতাদাহ (রহঃ) বলেন যে, সালাত প্রতিষ্ঠিত করার অর্থ হচ্ছে সালাতের সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা, ভালোভাবে ওযূ করা এবং রুকূ‘ ও সাজদাহ যথাযথভাবে আদায় করা। (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম ১/৩৭) মুকাতিল (রহঃ) বলেন যে, সময়ের হিফাযত করা, পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করা, রুকূ‘ ও সাজদাহ ধীর-স্থিরভাবে আদায় করা, ভালোভাবে কুর’আন পাঠ করা, আত্তাহিয়্যাতু এবং যথাযথভাবে দরূদ পাঠ করার নাম হচ্ছে ইকামতে সালাত। (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম ১/৩৭)
‘ব্যয় করতে হবে’ কোথায়
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ﴿وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ﴾-এর অর্থ হচ্ছে যাকাত আদায় করা। (তাফসীর তাবারী ১/২৪৩) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ), ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) এবং আরো কয়েকজন সাহাবী বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে মানব কর্তৃক তার সন্তান সন্ততিকে পানাহার করানো। এটা যাকাতের হুকুমের পূর্বেকার আয়াত। যাহ্হাক (রহঃ) বলেন যে, সূরাহ্ বারা’আতে যাকাতের যে সাতটি আয়াত আছে তা অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে এই নির্দেশ ছিলো যে, বান্দা যেন নিজ সাধ্যানুসারে কমবেশি কিছু দান করতে থাকে। কাতাদাহ (রহঃ) বলেনঃ ‘এই মাল তোমাদের নিকট মহান আল্লাহর আমানত, অতি সত্বরই এটা তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। সুতরাং ইহলৌকিক জীবনে তা থেকে মহান আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’
ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি মুত্বলাক তথা সাধারণ। যাকাত, সন্তান সন্ততির জন্য খরচ এবং যেসব লোককে দেয়া প্রয়োজন এ সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আর এ জন্য মহান আল্লাহ একটি সাধারণ বিশেষণ বর্ণনা করেছেন এবং সাধারণভাবে প্রশংসা করেছেন। কাজেই সব খরচই এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
কুর’আনুল কারীমের অধিকাংশ জায়গায় সালাত ও মাল খরচ করার বর্ণনা মিলিতভাবে এসেছে। এ জন্য সালাত হচ্ছে মহান আল্লাহর হক এবং তাঁর ‘ইবাদত, যা তাঁর একাত্মবাদ, প্রশংসা, শ্রেষ্ঠত্ব, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন, তাঁর ওপর ভরসা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করার নাম। আর খরচ করা হচ্ছে সৃষ্ট জীবের প্রতি অনুগ্রহ করা যার দ্বারা তাদের উপকার হয়। এর সবচেয়ে বেশি হকদার হচ্ছে তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয় স্বজন এবং দাসদাসী। তারপর দূরের লোক এবং অপরিচিত ব্যক্তিরা তার হকদার। সুতরাং অবশ্য করণীয় সমস্ত ব্যয় ও ফরয যাকাত এর অন্তর্ভুক্ত। সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ، وَحَجِّ الْبَيْتِ
‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি। (১) আল্লাহ তা‘আলার একাত্মবাদ ও নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রেরিতত্বের সাক্ষ্য প্রদান। (২) সালাত প্রতিষ্ঠা করা। (৩) যাকাত প্রদান করা। (৪) রামাযানের সিয়াম পালন করা এবং (৫) বায়তুল্লার হাজ্জ সম্পাদন করা। (হাদীস সহীহ। ফাতহুল বারী ১/৬৪, সহীহ মুসলিম ১/৪৫) এ সম্পর্কে আর বহু হাদীস রয়েছে।
‘সালাত’ কি
‘আরবী ভাষায় সালাতের অর্থ হচ্ছে প্রার্থনা। আবার কবিদের কবিতা এর সাক্ষ্য দেয়। সালাতের প্রয়োগ হয়েছে সালাতের ওপর যা রুকূ’ সাজদাহ এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট কতকগুলো কাজের নাম এবং যা নির্দিষ্ট সময়ে কতোগুলো নির্দিষ্ট শর্ত, সিফাত ও পদ্ধতির মাধ্যমে পালিত হয়। ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন, সালাত সালাত বলার কারণ এই যে, সালাত আদায়কারী ব্যক্তি স্বীয় কাজের মাধ্যমে পুণ্য প্রার্থনা করে এবং মহান আল্লাহর নিকট তার প্রয়োজন পূরণের আবেদন করে।
কেউ কেউ বলেছেনঃ যে দু’টি শিরা পৃষ্ঠদেশ থেকে মেরুদণ্ডের অস্থিও দু দিকে এসে থাকে তাকে ‘আরবী ভাষায় صلوين বলা হয়। আর সালাতে এটা নড়া চড়া করে বিধায় তাকে صلاة বলা হয়েছে। কিন্তু এ উক্তিটি সঠিক নয়।
আবার কেউ কেউ বলেছেন এটা صلي থেকে নেয়া হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে সংলগ্ন ও সংযুক্ত থাকা। যেমন কুর’আন মাজীদে আছে, لا يصلها إلا الأتقى অর্থাৎ দুর্ভাগা ব্যক্তি ছাড়া কেউই জাহান্নামে চিরকাল থাকবে না। (সূরাহ আল লাইল, আয়াত ১৫)
কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, যখন কাঠকে সোজা করার জন্য আগুনের ওপর রাখা হয় তখন ‘আরববাসীরা تصلية বলে থাকে। সালাতের মাধ্যমে আত্মার বক্রতাকে সোজা করা হয় বলে একে صلاة বলা হয়েছে। যেমন কুর’আন মাজীদে আছেঃ ﴿اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰى عَنِ الْفَحْشَآءِ وَالْمُنْكَرِ﴾
‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (২৯ নং সূরাহ আল ‘আনক্বাবুত, আয়াত নং ৪৫) তবে যে যা-ই বলুক, صلاة এর অর্থ প্রার্থনা হওয়াই সর্বাপেক্ষা সঠিক ও প্রসিদ্ধ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
Social Share
Share With Social Media
Or Copy Link
Be our beacon of hope! Your regular support fuels our mission to share Quranic wisdom. Donate monthly; be the change we need!
Be our beacon of hope! Your regular support fuels our mission to share Quranic wisdom. Donate monthly; be the change we need!
Are You Sure you want to Delete Pin
“” ?
Add to Collection
Bookmark
Pins
Social Share
Share With Social Media
Or Copy Link
Audio Settings