Surah Al Mujadila Tafseer
Tafseer of Al-Mujadila : 2
Saheeh International
Those who pronounce thihar among you [to separate] from their wives - they are not [consequently] their mothers. Their mothers are none but those who gave birth to them. And indeed, they are saying an objectionable statement and a falsehood. But indeed, Allah is Pardoning and Forgiving.
Ibn Kathir Full
Tafseer 'Ibn Kathir Full' (BN)
২-৪ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার এবং (আমার স্বামী) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলা সূরায়ে মুজাদালার প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। আমি তার ঘরে ছিলাম। তিনি খুবই বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর চরিত্রও ভাল ছিল না। একদা তিনি আমার কাছে আসেন, আমি তাকে এমন এক কথা বলে ফেলি যে, তিনি রাগান্বিত হন এবং আমাকে বলে ফেলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।” তারপর তিনি ঘর হতে বেরিয়ে যান। এবং কওমী মজলিসে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। অতঃপর তিনি বাড়ীতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি আমার সাথে কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চাইলে আমি বলিঃ কখনো না, যার হাতে খুওয়াইলাহর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আপনার। একথা (যিহারের কথা) বলার পর আপনি আপনার এ মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারেন না যে পর্যন্ত না আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ফায়সালা হয়। কিন্তু তিনি মানলেন না, বরং জোর পূর্বক তাঁর কাম বাসনা চরিতার্থ করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি দুর্বল ছিলেন বলে আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম এবং তিনি পরাজিত হলেন। আমি আমার প্রতিবেশিনীর বাড়ী গিয়ে একটা কাপড় চেয়ে নিলাম এবং তা গায়ে দিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট গমন করলাম। আমার স্বামীর সাথে আমার যা কিছু ঘটেছিল তা আমি তাঁর সামনে নিঃসংকোচে বর্ণনা করলাম এবং তার দুশ্চরিত্রতার অভিযোগ করলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাকে বলতে থাকলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ্ (রঃ)! তোমার স্বামীর ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় কর, সে তো অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে।” আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে এসব কথাবার্তা চলতে আছে ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হতে শুরু হয়। শেষ হলে তিনি বলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ (রাঃ)! তোমার ও তোমার স্বামীর ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। তারপর তিনি আমাকে বলেনঃ “তোমার স্বামীকে বলল যে, সে যেন একটি গোলাম আযাদ - করে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গোলাম আযাদ করার মত সামর্থ্য তার নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে সে যেন একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখে।” আমি বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো অতি বৃদ্ধ। দুই মাস রোযা রাখার শক্তি তার নেই। তাহলে সে যেন এক অসাক (প্রায় পাকি চার মণ) খেজুর ষাটজন মিসকীনকে খেতে দেয়।” বললেন তিনি। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ পরিমাণ খেজুরও তার কাছে নেই। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, আমি অর্ধ অসাক খেজুর তাকে দিচ্ছি।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঠিক আছে, বাকী অর্ধেক আমি দিচ্ছি। তিনি বললেনঃ “বাঃ, বাঃ! খুবই ভাল কাজ করলে তুমি। যাও, এটা আদায় করছে। আর তোমার স্বামীর সাথে প্রেম-প্রীতি, শুভাকাঙ্ক্ষা ও আনুগত্য সহ জীবন কাটিয়ে দাও।” আমি বললামঃ আমি তাই করবো। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
কোন কোন রিওয়াইয়াতে মহিলাটির নাম খুওয়াইলাহ্ এর স্থলে খাওলাহ্ রয়েছে এবং বিনতু সা'লাবাহ্ এর স্থলে বিনতে মালিক ইবনে সা'লাবাহ্ আছে। এসব উক্তিতে এমন কোন মতপার্থক্য নেই যে, একে অপরের বিরোধ হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
এই সূরার প্রাথমিক এই আয়াতগুলোর সঠিক শানে নুযূল এটাই। হযরত সালমা ইবনে সাখ আনসারীর (রাঃ) ঘটনাটি যা এখনই আসছে, এ আয়াতগুলোতে আছে, এই হুকুমই সেখানেও দেয়া হয়েছে অর্থাৎ গোলাম আযাদ করা বা দুই মাস একাদিক্রমে রোযা রাখা অথবা ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খেতে দেয়া।
ঘটনাটি হযরত সালমা ইবনে সাখর আনসারী (রাঃ) নিজেই নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ
“অন্যদের তুলনায় আমার স্ত্রী-সহবাসের ক্ষমতা অধিক ছিল। রমযান মাসে দিনের বেলায় আমি নিজেকে হয় তত সহবাস হতে বিরত রাখতে পারবো না এই ভয়ে সারা রমযান মাসের জন্যে আমার স্ত্রীর সাথে আমি যিহার করে ফেলি। একদা রাত্রে আমার স্ত্রী আমার সেবায় লিপ্ত ছিল এমতাবস্থায় তার দেহের কোন এক অংশ হতে কাপড় সরে যায়। তখন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়ি। সকাল হলে আমি আমার কওমের কাছে ফিরে আমার রাত্রির ঘটনাটি বর্ণনা করি এবং তাদেরকে বলিঃ তোমরা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট চল এবং তাকে আমার ঘটনাটি অবহিত কর।
তারা সবাই আমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলো এবং বললোঃ “আমরা তোমার সাথে যাবো না। হতে পারে যে, এ ব্যাপারে কুরআন কারীমে কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়ে যাবে অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন কথা বলে দিবেন যার ফলে আমরা চিরদিনের জন্যে কলংকিত হবো। তুমি নিজেই যাও এবং দেখো, তোমার ব্যাপারে কি ঘটে।” আমি তখন বেরিয়ে পড়লাম এবং নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে গেলাম। অতঃপর তাকে আমি আমার খবর অবহিত করলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী, হ্যাঁ, আমি এ কাজ করেছি। পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, জনাব! আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে। আবার তিনি বললেনঃ “এ কাজ করেছো তুমি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, হুযুর! সত্যিই আমি এ কাজ করে ফেলেছি। সুতরাং আমার উপর আপনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর হুকুম জারী করুন! আমি ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করবে। তখন তিনি বললেনঃ “তুমি একটি গোলাম আযাদ কর।” আমি তখন আমার গদানে হাত রেখে বললামঃ যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি শুধু এরই (অর্থাৎ আমার গদানেরই) মালিক। এ ছাড়া আমি আর কিছুরই মালিক নই (অর্থাৎ আমার গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখো।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রোযার কারণেই তো আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে (সুতরাং এটাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়)। তিনি বললেনঃ “যাও, তাহলে সাদকা কর।” আমি বললামঃ আপনাকে যিনি সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমার কাছে সাদকা করার মত কিছুই নেই। এমন কি আজ রাত্রে আমার পরিবারের সবাই ক্ষুধার্ত রয়েছে। তাদের রাত্রির খাবার পর্যন্ত নেই!
তিনি তখন আমাকে বললেনঃ “তুমি বানু রুয়েক গোত্রের সাদকার মালিকদের কাছে যাও এবং তাদেরকে বল যে, তারা যেন তাদের সাদকার মাল তোমাকেই দেয়। তুমি ওর মধ্য হতে এক অসাক খেজুর ষাটজন মিসকীনকে প্রদান করবে এবং বাকীগুলো তোমার নিজের ও পরিবারের কাজে ব্যয় করবে।”
রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর একথা শুনে আমি খুশী মনে ফিরে আসলাম এবং আমার কওমের কাছে গিয়ে বললামঃ “তোমাদের কাছে আমি পেয়েছিলাম সংকীর্ণতা ও মন্দ অভিমত। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে পেয়েছি আমি প্রশস্ততা ও বরকত। তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা যেন তোমাদের সাদকার মাল আমাকেই প্রদান কর। তারা তখন আমাকে তা দিয়ে দিলো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযীও (রঃ) সংক্ষিপ্তভাবে এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনি
এটাকে হাসান বলেছেন)
বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, এটা হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ) এবং তার স্ত্রী হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ)-এর ঘটনার পরবর্তী ঘটনা। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যিহারের প্রথম ঘটনা হচ্ছে হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ঘটনাটি, যিনি হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিতের (রাঃ) ভাই ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল খাওলা বিনতে সা'লাবাহ্ ইবনে মালিক। এই ঘটনার পর হযরত খাওলা (রাঃ)-এর এই ভয় ছিল হয়তো তালাক হয়ে গেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসে বলেনঃ আমার স্বামী আমার সাথে যিহার করেছে। যদি আমরা পৃথক পৃথক হয়ে যাই তবে আমরা দুজনই ধ্বংস হয়ে যাবো। আর কোন সন্তানের জন্মদান করার মত ক্ষমতা আমার নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমি তার সাথে সংসার করে আসছি।” এভাবে তিনি কথা বলছিলেন এবং ক্রন্দন করছিলেন। এ পর্যন্ত ইসলামে যিহারের কোন হুকুম ছিল। ঐ সময় (আরবী) হতে পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা তোমার আছে কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কসম! এ ক্ষমতা আমার নেই।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁর জন্যে অর্থ সংগ্রহ করেন এবং তা দিয়ে তিনি গোলাম আযাদ করেন। আর এভাবে তিনি তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়াও আরো বহু গুরুজনও একথাই বলেছেন যে, এ আয়াতগুলো তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। এসব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
(আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে এসেছে। অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করার সময় বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।" শরীয়তের হুকুম এই যে, এরূপভাবে যে কোন অঙ্গের নাম নিবে, তাতে যিহার হয়ে যাবে। জাহেলিয়াতের যুগে যিহারকে তালাক মনে করা হতো। আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের জন্যে এতে কাফফারা নির্ধারণ করেছেন এবং এটাকে তালাক রূপে গণ্য করেননি, যেমন জাহেলিয়াতের যুগে এই প্রথা ছিল। পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন একথাই বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) অজ্ঞতার যুগের এই প্রথার উল্লেখ করে বলেনঃ ইসলামে যখন হযরত খুওয়াইলাহ্ সম্পর্কীয় ঘটনাটি সংঘটিত হলো এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলো তখন হযরত আউস (রাঃ) তার স্ত্রীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) চিরুণী করছিলেন। তিনি ঘটনাটি শুনে বললেনঃ “আমাদের কাছে এর কোন নির্দেশ নেই।” ইতিমধ্যে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তিনি হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ)-কে সুসংবাদ প্রদান করেন। যখন গোলাম আযাদ করার কথা উল্লেখ করা হয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে কোন গোলাম নেই। আমার স্বামী গোলাম আযাদ করতে সক্ষম নন।” তারপর একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখার নির্দেশ দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার স্বামী যদি দিনে তিনবার করে পানি পান না করেন তবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে।” এরপর যখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতেও যে অসমর্থ, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে।' তখন হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ) বলেনঃ “কয়েক গ্রাস খাদ্য খেয়েই তো আমাদেরকে সারা দিন কাটিয়ে দিতে হয়, অন্যদেরকে খাওয়ানো তো বহু দূরের কথা!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অর্ধ অসাক ত্রিশ সা’ (খাদ্য) আনিয়ে নিয়ে তাঁকে দিলেন এবং তাঁর স্বামীকে নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ খুবই সবল ও উত্তম। কিন্তু বর্ণনার ধারা গারাবত মুক্ত নয়)
আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, খাওলা বিনতে দালীজ (রাঃ) একজন আনসারীর স্ত্রী ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি ছিলেন খুব দরিদ্র এবং তার চরিত্রও খুব ভাল ছিল না। একদিন কথায় কথায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়ে যায় এবং জাহেলিয়াত যুগের প্রথা ও রীতি অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীর সাথে যিহার করে নেন। অজ্ঞতা যুগের এটাই ছিল তালাক। স্ত্রী হযরত খাওলা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হন। ঐ সময় তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর মস্তক ধৌত করছিলেন। হযরত খাওলা (রাঃ) তাঁর সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এখন আর কি হতে পারে? আমার জানা মতে তুমি তার উপর হারাম হয়ে গেছে। তাঁর একথা শুনে হযরত খাওলা (রাঃ) বললেনঃ “আমি আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছি।" হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মস্তক মুবারকের এক দিক ধুয়ে দিয়ে ঘুরে অন্য দিকে গেলেন এবং ওদিকের অংশ ধুতে লাগলেন। তখন হযরত খাওলাও (রাঃ) ঘুরে গিয়ে ওদিকে বসে পড়েন এবং স্বীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পুনরায় ঐ জবাবই দেন।
হযরত আয়েশা (রাঃ) লক্ষ্য করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর চেহারা মুবারকের রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখন তিনি হযরত খাওলা (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি একটু সরে বসো।" তিনি সরে গেলেন। ইতিমধ্যে অহী নাযিল হতে শুরু হয়। অহী নাযিল হওয়া শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করেনঃ “মহিলাটি কোথায়?” হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁকে ডাকিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁকে বলেনঃ “যাও, তোমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে এসো।” তিনি কাঁদতে কাঁদতে গেলেন এবং স্বামীকে ডেকে নিয়ে এলেন। স্বামী সম্পর্কে যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন যে, তিনি কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন, দরিদ্র এবং দুশ্চরিত্র, নবী (সঃ) তাঁকে সেরূপই পেলেন। তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী)
অতঃপর মহিলাটির স্বামীকে বললেনঃ “তুমি স্ত্রীকে স্পর্শ করার পূর্বে গোলাম আযাদ করতে পার কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে কি তুমি সক্ষম হবে?” জবাবে তিনি বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আমি দিনে দুইবার বা তিনবার না খেলে আমার চক্ষু নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “না, তবে যদি আপনি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে পারবো)।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে সাহায্য করলেন এবং তাঁকে বললেনঃ “ষাটজন মিসকীনকে খানা খাওয়ায়ে দাও।” আল্লাহ্ তা'আলা জাহেলিয়াত যুগের প্রথা, তালাককে উঠিয়ে দিয়ে এটাকে যিহাররূপে নির্ধারণ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, “ঈলা ও যিহার জাহেলিয়াতের যুগের তালাক ছিল। আল্লাহ তা'আলা ঈলায় তো চার মাস সময় নির্ধারণ করেন এবং যিহারে নির্ধারণ করেন কাফফারা।
হযরত ইমাম মালিক (রঃ) (আরবী) শব্দ দ্বারা দলীল গ্রহণ করে বলেন যে, এখানে মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, সুতরাং কাফিররা এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। জমহুরের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা (আরবী) শব্দের এই জবাব দেন যে, প্রাধান্য হিসাবে এটা বলা হয়েছে। সুতরাং (আরবী) হিসেবে (আরবী) উদ্দেশ্য হতে পারে না। জমহুর (আরবী) দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, দাসীর সাথে যিহার হয় না এবং দাসী এই বা সম্বোধনের মধ্যে দাখিলও নয়।
আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবী) (তাদের পত্নীগণ তাদের মা নয়, যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা)। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির তার স্ত্রীকে (আরবী) বা (আরবী) অথবা (আরবী) কিংবা এগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত কথা বলার দ্বারা স্ত্রী কখনো তার মা হতে পারে না। বরং যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা। তারা তো অসংগত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল। তিনি জাহেলিয়াত যুগের এই সংকীর্ণতাকে তোমাদের হতে দূর করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক ঐ কথা যা কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় সেটাও তিনি ক্ষমা করে দেন। যেমন সুনানে আবি দাউদে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) শুনতে পান যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে বলছেঃ “হে আমার বোন!” তখন তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা কি তোমার বোন?” অর্থাৎ তার এ উক্তিকে তিনি অপছন্দ করেন এবং তাকে বাধা দেন। কিন্তু ঐ স্ত্রীকে তিনি তার জন্যে হারাম করে দিলেন না। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তার এটা উদ্দেশ্য ছিল না, শুধু মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল মাত্র। অন্যথায় অবশ্যই ঐ স্ত্রী তার জন্যে হারাম হয়ে যেতো। কেননা, সঠিক উক্তি এটাই যে, নিজের স্ত্রীকে যে ব্যক্তি তাদের নামে স্মরণ করে যারা চিরস্থায়ীভাবে মুহাররামাত (যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে অবৈধ) যেমন ভগ্নী, ফুফু, খালা ইত্যাদি, তবে এরাও মাতার হুকুমের পর্যায়ে পড়ে যাবে।
মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে নিজেদের উক্তি হতে ফিরে আসে।” এর একটি ভাবার্থ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, যিহার করলো, অতঃপর এই শব্দেরই পুনরাবৃত্তি করলো। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর উক্তি মতে এর ভাবার্থ হলোঃ যিহার করলো, তারপর ঐ স্ত্রীকে আটক করে রাখলো। শেষ পর্যন্ত এমন এক যামানা অতিবাহিত হলো যে, ইচ্ছা করলে নিয়মিতভাবে তাকে তালাক দিতে পারতো, কিন্তু তালাক দিলো না।
ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ আবার ফিরে আসলো সহবাসের দিকে অথবা সহবাসের ইচ্ছা করলো। এটা বৈধ নয় যে পর্যন্ত না উল্লিখিত কাফফারা আদায় করে।
ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সহবাস করার ইচ্ছা করলো বা তার সাথে জীবন যাপন করার দৃঢ় সংকল্প করলো।
ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো যিহারের দিকে ফিরে আসা, এর হুরমত ও জাহেলিয়াত যুগের হুকুম উঠে যাওয়ার পর। সুতরাং এখন যে ব্যক্তি যিহার করবে তার উপর তার স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে যে পর্যন্ত না সে কাফফারা আদায় করে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যে বিষয়কে সে নিজের জীবনের উপর হারাম করে নিয়েছিল সেটা আবার সে বৈধ করতে চায় সে যেন কাফফারা আদায় করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায় করার পূর্বে সহবাস করা নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি গুপ্তাঙ্গ ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করে তবে কোন দোষ নেই।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এখানে (আরবী) দ্বারা সহবাস করাকে বুঝানো হয়েছে।
যুহরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায়ের পূর্বে হাত লাগানো, ভালবাসা দেখানো ইত্যাদিও জায়েয নয়।
আহলুস সুনান হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছি এবং কাফফারা আদায়ের পূর্বে তার সাথে সহবাসও করে ফেলেছি (এখন উপায় কি?)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ্ তোমার প্রতি দয়া করুন, তুমি এটা কেন করেছো?” উত্তরে সে বলেঃ “চাঁদনী রাতে তার পাঁয়জোর (পায়ের অলংকার) আমাকে ব্যাকুল করে তুলেছিল।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “এখন হতে আর তার নিকটবর্তী হয়ো না যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী কাফফারা আদায় কর।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান, গারীব, সহীহ বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটাকে মুরসাল রূপে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা মুরসাল হওয়াকেই সঠিক বলেছেন)
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ যিহারের কাফফারার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, একটি দাস মুক্ত করতে হবে। দাসকে যে মুমিন হতে হবে এ শর্ত এখানে আরোপ করা হয়নি, যেমন হত্যার কাফফারায় দাসের মুমিন হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তো বলেন যে, এই অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টের উপর স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ হত্যার কাফফারার ব্যাপারে যেমন মুমিন গোলাম আযাদ করার হুকুম রয়েছে, তেমনই এই যিহারের কাফফারার ব্যাপারেও ঐ হুকুমই থাকবে। এর দলীল এই হাদীসটিও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একটি কালো রঙ এর দাসী সম্পর্কে বলেনঃ “একেই আযাদ বা মুক্ত করে দাও, কেননা, এটা মুমিনা দাসী।”
উপরে বর্ণিত ঘটনায় জানা গেছে যে, যিহার করে কাফফারা আদায় করার পূর্বেই স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দ্বিগুণ কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেননি।
এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ এই নির্দেশ তোমাদেরকে দেয়া হলো, অর্থাৎ তোমাদের ধমকানো হচ্ছে। আল্লাহ্ তোমাদের কার্যের ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তোমাদের অবস্থা তিনি সম্যক অবগত। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার খবর রাখেন।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ গোলাম আযাদ করার যার সামর্থ্য থাকবে না, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাকে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে হবে। যে এতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে।
পূর্ববর্ণিত হাদীসগুলোর আলোকে জানা যাচ্ছে যে, আদিষ্ট প্রথম সুরতটি (গোলাম আযাদ করা) হলো অগ্রগণ্য, তারপর দ্বিতীয়টি (একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখা) এবং এরপর তৃতীয়টি (ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো)। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের এ হাদীসটিতেও রয়েছে যাতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রমযান মাসে স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী লোকটিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মহান আল্লাহ বলেন, এই আহকাম আমি এ জন্যেই নির্ধারণ করেছি যে, যেন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে (সঃ) বিশ্বাস স্থাপন কর। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। সাবধান! তোমরা তার বিধানের উল্টো কাজ করো না, তার নিষিদ্ধ বিষয়ের সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না।
মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা কাফির হবে অর্থাৎ ঈমান আনয়ন করবে না, আমার আদেশ মান্য করবে না, শরীয়তের আহকামের অমর্যাদা ও অসম্মান করবে এবং ওর প্রতি বেপরোয়া ভাব দেখাবে, তারা আমার শাস্তি হতে বেঁচে যাবে এ ধারণা তোমরা কখনো পোষণ করো না। জেনে রেখো যে, তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
Social Share
Share With Social Media
Or Copy Link
Be our beacon of hope! Your regular support fuels our mission to share Quranic wisdom. Donate monthly; be the change we need!
Be our beacon of hope! Your regular support fuels our mission to share Quranic wisdom. Donate monthly; be the change we need!
Are You Sure you want to Delete Pin
“” ?
Add to Collection
Bookmark
Pins
Social Share
Share With Social Media
Or Copy Link
Audio Settings