Surah Al Baqarah Tafseer
Tafseer of Al-Baqarah : 142
Saheeh International
The foolish among the people will say, "What has turned them away from their qiblah, which they used to face?" Say, "To Allah belongs the east and the west. He guides whom He wills to a straight path."
Ibn Kathir Partial
Tafseer 'Ibn Kathir Partial' (BN)
কিবলার পরিবর্তন ও সালাতের দিক নিদের্শনা
যুজাজ (রহঃ) বলেন যে, অত্র আয়াতের মধ্যস্থিত سفهاء এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘আরবের মুশরিকরা। আর মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, ইয়াহুদীদের পণ্ডিত ব্যক্তিরা উদ্দেশ্য। আর সুদ্দী (রহঃ) বলেন তারা হলো মুনাফিক। তবে মূলকথা হলো অত্র আয়াতটি ওপরের সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করে। মহান আল্লাহ ভালো জানেন।
সহীহুল বুখারীতে বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম )ষোল বা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছেন। কা‘বা ঘর তাঁর কিবলাহ হোক এটাই তাঁর মনের বাসনা ছিলো। হুকুম প্রাপ্তির পর তিনি ঐ দিকে মুখ করে প্রথম ‘আসরের সালাত আদায় করেন। যেসব লোক তাঁর সাথে সালাত আদায় করেছিলেন তাঁদের মধ্যে থেকে একজন লোক মাসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানকার লোকেরা রুকূ‘র অবস্থায় ছিলেন। ঐ লোকটি বলেনঃ ‘মহান আল্লাহ্র শপথ! আমি মহানবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সঙ্গে মাক্কার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছি।’ এ কথা শুনামাত্রই ঐ সব লোক ঐ অবস্থায়ই কা‘বার দিকে মুখ করেন। কিবলাহ পরিবর্তনের নির্দেশের পূর্বে যাঁরা মারা গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বহু লোক শহীদও হয়েছিলেন। তাঁদের সালাত সম্বন্ধে কি বলা যায় তা জনগণের জানা ছিলো না। অবশেষে মহান আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ
﴿وَ مَا كَانَ اللّٰهُ لِیُضِیْعَ اِیْمَانَكُمْ اِنَّ اللّٰهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ﴾
‘আর মহান আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের বিশ্বাস বিনষ্ট করেন; নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি স্নেহশীল, করুণাময়।’ (২ নং সূরা আল বাকারাহ, আয়াত নং ১৪৩, সহীহুল বুখারী-৮/২০/৪৪৮৬, ফাতহুল বারী ৮/২০) সহীহ মুসলিমে এ বর্ণনাটি অন্যভাবে রয়েছে। (হাদীসটি সহীহ। সহীহ মুসলিম ১/১১, ১২/৩৭৪)
মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক বারা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন এবং অধিকাংশ সময় আকাশের দিকে দৃষ্টি উঠিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করতেন। তখন নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং কা‘বা ঘর কিবলাহ রূপে নির্ধারিত হয়।
﴿قَدْ نَرٰى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِی السَّمَآءِ١ۚ فَلَنُوَلِّیَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضٰىهَا١۪ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ﴾
‘নিশ্চয়ই আমি আকাশের দিকে তোমার মুখমণ্ডল উত্তোলন অবলোকন করেছি। তাই আমি তোমাকে ঐ কিবলাহমুখীই করাচ্ছি যা তুমি কামনা করছো। অতএব তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখমণ্ডল ফিরিয়ে দাও। (২ নং সূরাহ্ বাকারাহ, আয়াত নং ১৪৪। সহীহ মুসলিম ১/৩৭৫)
এ সময় মুসলিমদের এক লোক বলেনঃ ‘কিবলাহ’ পরিবর্তনের পূর্বে যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের অবস্থা যদি আমরা জানতে পারতাম! সেই সময় মহান আল্লাহ অত্র আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ وَ مَا كَانَ اللّٰهُ لِیُضِیْعَ اِیْمَانَكُم ‘আর মহান আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের বিশ্বাস বিনষ্ট করবেন। (২ নং সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৪৩) আহলে কিতাবের মধ্যে থেকে কয়েকজন নির্বোধ এই কিবলাহ পরিবর্তনের ওপর আপত্তি আরোপ করে। তখন মহান আল্লাহঃ ﴿سَیَقُوْلُ السُّفَهَآءُ مِنَ النَّاسِ﴾ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (তাফসীর কুরতুবী ৩/১৩৩) ‘আলী ইবনে আবি তালহা (রহঃ) বর্ণনা করেন, ইবনে ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় হিজরত করার পর মহান আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দেন যে,তিনি যেন বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে দাঁড়ান।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মাদীনায় হিজরত করেন তখন বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ করা তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিলো। এতে ইয়াহুদীরা খুবই খুশি হয়েছিলো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইব্রাহীম (আঃ)-এর কিবলাহকে পছন্দ করতেন। সুতরাং কিবলাহ পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হলে ইয়াহুদীরা হিংসা বশতঃ বহু আপত্তি উত্থাপন করে। তখন মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ ﴿قُلْ لِّلّٰهِ الْمَشْرِقُ وَ الْمَغْرِبُ یَهْدِیْ مَنْ یَّشَآءُ اِلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ﴾
বলো, পূর্ব ও পশ্চিম মহান আল্লাহ্রই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথপ্রদর্শন করেন। (তাফসীর তাবারী ৩/১৩৮) এ ব্যাপারে অনেক হাদীসও রয়েছে।
মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কায় দুই ‘রুকুনের’ মধ্যবর্তী সাখারা-ই বায়তুল মুকাদ্দাসকে সামনে রেখে সালাত আদায় করতেন। যখন তিনি মদীনায় হিজরত করেন তখন ঐ দু’টিকে একত্রিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ জন্য মহান আল্লাহ তাঁকে সালাতে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার নির্দেশ প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কুর’আনুল হাকীমের মাধ্যমে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো, নাকি অন্য কিছুর মাধ্যমে দেয়া হয়েছিলো এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন মুফাস্সির বলেন যে এটা একটি ইজতিহাদী বিষয় ছিলো এবং মদীনায় আগমনের পরে কয়েক মাস পর্যন্ত তিনি এর ওপরই ‘আমল করেন, যদিও তিনি মহান আল্লাহ কর্তৃক কিবলাহ পরিবর্তনের নির্দেশের প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকতেন।
বানূ সালামার মাসজিদকে মাসজিদে কিবলাতাইন বলার কারণ
অবশেষে তার প্রার্থনা গৃহীত হয় এবং সর্বপ্রথম তিনি ঐ দিকে মুখ করে ‘আসরের সালাত আদায় করেন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা যোহরের সালাত ছিলো। আবূ সা‘ঈদ ইবনে আল মুয়াল্লা (রাঃ) বলেন, আমি ও আমার সাথী প্রথমে কা‘বার দিকে মুখ করে সালাত পড়েছি এবং এটা যোহরের সালাত ছিলো। কোন কোন মুফাসসিরের বর্ণনায় রয়েছে যে যখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর কিবলাহ পরিবর্তনের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বানী সালামার মাসজিদে যোহরের সালাত পড়েছিলেন দু’রাক‘আত পড়া শেষ করে ফেলেছিলেন, অবশিষ্ট দু’ রাক‘আত তিনি বায়তুল্লাহ এর দিকে মুখ করে পড়েন। এই কারণেই এই মাসজিদের নাম হয়েছে মাসজিদুল কিবলাতাইন অথাৎ দু’কিবলার মাসজিদ। নুওয়াইলা বিনতি মুসলিম (রাঃ) বলেন আমরা যোহরের সালাত ছিলাম এমন সময় আমরা এ সংবাদ পাই, আমরা সালাতের মধ্যেই ঘুরে যাই। পুরুষ লোকেরা স্ত্রীলোকদের জায়গায় এসে পড়ে এবং স্ত্রীলোকেরা পুরুষ লোকদের জায়গায় পৌঁছে যায়। তবে কুবা বাসীর নিকট পরদিন ফজরের সালাতের সময় এ সংবাদ পৌঁছে।
ইমাম বুখারী (রহঃ) তার সহীহ গ্রন্থে লিখেছেন যে, কিবলাহ পরিবর্তনের খবর যখন প্রচার করা হয় তখন কিছু আনসার বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করছিলো। এ খবর শোনার সাথে সাথে তারা কিবলাহ পরিবর্তন করে কা‘বার দিকে ফিরে বাকী সালাত আদায় করেন। ঐ আনসারগণ ছিলেন বানু সালামাহ গোত্রের। (সহীহুল বুখারী ৩৯৯)
‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মানুষ ‘কুবা’ মাসজিদে ফজরের সালাত আদায় করছিলো, হঠাৎ কোন আগন্তক বলে যে, রাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওপর কুর’আন মাজীদের মাধ্যমে হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে এবং কা‘বা ঘরের দিকে মুখ করার নির্দেশ হয়েছে। সুতরাং আমরাও সিরিয়ার দিক হতে মুখ সরিয়ে কা‘বার দিকে মুখ করে নেই। (ফাতহুল বারী ৮/২৪, মুসলিম ১/৩৭৫) এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেলো যে, কোন ‘নাসিখের’ হুকুম তখনই অবশ্য পালনীয় হয়ে থাকে যখন তা জানা যায়, যদিও তা পূর্বেই বলবত হয়ে গেছে। কেননা এই মহোদয়গণকে ‘আসর, মাগরিব ও ‘ঈশার সালাত পুনরায় আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়নি। (হাদীসটি সহীহ। সহীহ মুসলিম ১/১৩/৩৭৫, সুনান নাসাঈ ১/২৬৫/৪৯২, মুওয়াত্তা ইমাম মালিক ১/৬/১৯৫, মুসনাদ আহমাদ ২/১০, ১৬, ১১৩) মহান আল্লাহই বেশি জানেন।
এখন অন্য পন্থী এবং দুর্বল বিশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তিরা বলতে আরম্ভ করে যে, কখনো একে এবং কখনো ওকে কিবলাহ বানানোর কারণটা কি? তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, হুকুম ও ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহ্রই। মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴿ فَاَیْنَمَا تُوَلُّوْا فَثَمَّ وَجْهُ اللّٰهِ ﴾
‘অতএব তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও সে দিকেই মহান আল্লাহ্র দিক।’ (২ নং সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৫৫)
অপর আয়াতে মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿ لَیْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوْا وُجُوْهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَ الْمَغْرِبِ وَ لٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللّٰهِ ﴾
তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল পূর্ব বা পশ্চিম দিকে প্রত্যাবর্তিত করলেই তাতে পুণ্য নেই, বরং পুণ্য তার যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। (২ নং সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৭৭)
এ আয়াতের মর্ম হচ্ছেঃ উত্তম ‘আমল হলো মহান আল্লাহ্র আদেশকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরা। অতঃপর তিনি আমাদেরকে যা কিছু করতে বলবেন তার মুকাবিলা করা। তিনি যদি প্রতিদিন নতুন নতুন জায়গায় নতুন কিছুর মুকাবিলা করতে বলেন তাহলে তা বিনা বাক্য ব্যয়ে সময় ক্ষেপণ না করে তৎক্ষনাত পালন করা। কারণ আমরা তাঁর দাস, আমাদের ওপর তাঁরই কর্তৃত্ব, তিনি যা বলবেন তা পালন করাই আমাদের কর্তব্য। অবশ্যই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার দিকে খেয়াল রাখেন এবং তাঁর বান্দা ও রাসূলের প্রতি তিনি অত্যন্ত দয়ালু। মহান আল্লাহ তাঁর বন্ধু ইব্রাহীম (আঃ)-এর কিবলাহর দিকে মুসলিমদের কিবলাহ নির্ধারণ করে সরল পথে পরিচালিত করেছেন। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, পবিত্রতম ও সম্মানিত স্থান কা‘বাকে কিবলাহ করার আদেশ দিয়ে মুসলিমদের সম্মানিত করেছেন। একটি মারফূ‘ ‘হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
"إنهم لا يحسدوننا على شيء كما يحسدوننا على يوم الجمعة، التي هدانا الله لها وضلوا عنها، وعلى القبلة التي هدانا الله لها وضلوا عنها، وعلى قولنا خلف الإمام: آمين"
‘এ ব্যাপারে আমাদের ওপর ইয়াহুদীদের খুবই হিংসা রয়েছে যে, আমাদেরকে জুমু‘আর দিনের তাওফীক প্রদান করা হচ্ছে এবং তারা তা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আর এর ওপর যে, আমাদের কিবলাহ এটি এবং তারা এর থেকে ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আমাদের সজোরে ‘আমীন’ বলার ওপরেও তাদের বড়ই হিংসা রয়েছে, যা আমরা ইমামের পিছনে বলে থাকি।’ (হাদীসটি সহীহ। মুসনাদে আহমাদ ৬/১৩৫, সহীহ ইবনে খুযায়মাহ্ ১/২৮৮/৫৭৪ সুনান ইবনে মাজাহ ১/৮৫৬/৫৭৮)
উম্মাতে মুহাম্মাদীর মর্যাদা
অতঃপর মহান আল্লাহ বলেন, হে উম্মাতে মুহাম্মাদীরা! তোমাদেরকে এই পছন্দনীয় কিবলাহর দিকে ফিরানোর কারণই এই যে, তোমরা পছন্দনীয় উম্মাত। তোমরা কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মাতের ওপর সাক্ষী স্বরূপ দাঁড়াবে। কেননা তারা সবাই তোমাদের মর্যাদা স্বীকার করে। وَسَط এর অর্থ এখানে ভালো ও উত্তম। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, কুরাইশ বংশ হিসেবে وَسَطُ عَرَبٍ অর্থাৎ ‘আরবের মধ্যে উত্তম। এটাও বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় গোত্রের মধ্যে وَسَط ছিলেন অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত বংশ সম্পন্ন ছিলেন। صَلَوةٌ وُسْطَى অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম সালাত, যেটি ‘আসরের সালাত, এটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সমস্ত উম্মাতের মধ্যে উম্মাতে মুহাম্মাদীই সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বলে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ শারী‘আতও দেয়া হয়েছে, সম্পূর্ণ সরল ও সঠিক পথও দেয়া হয়েছে এবং অতি স্পষ্ট ধর্মও দেয়া হয়েছে। এ জন্যই মহান আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ
﴿هُوَ اجْتَبٰىكُمْ وَ مَا جَعَلَ عَلَیْكُمْ فِی الدِّیْنِ مِنْ حَرَجٍ١ؕ مِلَّةَ اَبِیْكُمْ اِبْرٰهِیْمَ١ؕ هُوَ سَمّٰىكُمُ الْمُسْلِمِیْنَ١ۙ۬ مِنْ قَبْلُ وَ فِیْ هٰذَا لِیَكُوْنَ الرَّسُوْلُ شَهِیْدًا عَلَیْكُمْ وَ تَكُوْنُوْا شُهَدَآءَ عَلَى النَّاسِ﴾
‘তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কঠোরতা আরোপ করেননি; এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত; তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম এবং এই কিতাবেও, যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং তোমরাও স্বাক্ষী হও মানব জাতির জন্য।’ (২২ নং সূরা আল হাজ্জ, আয়াত নং ৭৮) মুসনাদে আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
"يدعى نوح يوم القيامة فيقال له: هل بلَّغت؟ فيقول: نعم. فيدعى قومه فيقال لهم: هل بلغكم؟ فيقولون: ما أتانا من نذير وما أتانا من أحد، فيقال لنوح: من يشهد لك؟ فيقول: محمد وأمته"
‘কিয়ামতের দিন নূহ (আঃ) কে ডাকা হবে এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ ‘তুমি কি আমার বার্তা আমার বান্দাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছিলে?’ তিনি বলবেনঃ ‘হ্যাঁ প্রভু! আমি পৌঁছে দিয়েছি।’ অতঃপর তাঁর উম্মাতকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ ‘নূহ কি তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছিলো?’ তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবে এবং বলবেঃ আমাদের নিকট কোন ভয় প্রদর্শনকারী আসেননি। তখন নূহ (আঃ) কে বলা হবেঃ তোমার উম্মাত তো অস্বীকার করছে, সুতরাং তুমি সাক্ষী হাযির করো। তিনি বলবেনঃ ‘হ্যাঁ, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর উম্মাত আমার সাক্ষী।’ এ জন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেনঃ ﴿وَكَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ اُمَّةً وَّسَطًا﴾ তোমাদেরকে আমি সত্যনিষ্ঠ জাতি করেছি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)বলেছেনঃ ‘ওয়াসাত’ শব্দের অর্থ হচ্ছে আদল বা ন্যায়নীতি সম্পন্ন। নূহ (আঃ) যে তাঁর প্রতি প্রেরিত বাণী যথাযথ পৌঁছিয়েছেন তার সাক্ষী হিসেবে তোমাদেরকে ডাকা হবে এবং তোমাদের সাক্ষ্যকে আমি প্রত্যায়ন করবো। (হাদীসটি সহীহ। সহীহুল বুখারী ৮/২১, মুসনাদে আহমাদ ৩/৩২, জামি‘ তিরমিযী ৮/২৯৭, সুনান নাসাঈ ৬/২৯২, ইবনে মাজাহ ২/১৪৩২)
মুসনাদে আহমাদে আরো একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেছেনঃ
"يجيء النبي يوم القيامة [ومعه الرجل والنبي] ومعه الرجلان وأكثر من ذلك فيدعى قومه، فيقال [لهم] (7) هل بلغكم هذا؟ فيقولون: لا. فيقال له: هل بلغت قومك؟ فيقول: نعم. فيقال [له] من يشهد لك؟ فيقول: محمد وأمته فيدعى بمحمد وأمته، فيقال لهم: هل بلغ هذا قومه؟ فيقولون: نعم. فيقال: وما علمكم؟ فيقولون: جاءنا نبينا صلى الله عليه وسلم فأخبرنا أن الرسل قد بلغوا" فذلك قوله عز وجل: { وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا } قال: "عدلا { لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا } " .
‘কিয়ামতের দিন কোন নবী আসবেন তাঁর সাথে তাঁর উম্মাতের শুধুমাত্র দু’টি লোকই থাকবে কিংবা তার চেয়ে বেশি। তাঁর উম্মাতকে আহ্বান করা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবেঃ ‘এই নবী কি তোমাদের নিকট ধর্ম প্রচার করেছিলেন?’ তারা অস্বীকার করবে। নবীকে তখন জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি ধর্ম প্রচার করেছিলে কি?’ তিনি বলবেনঃ ‘হ্যাঁ।’ তাঁকে বলা হবেঃ ‘তোমার সাক্ষী কে আছে?’ তিনি বলবেন, ‘মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর উম্মাত।’ অতঃপর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর উম্মাতকে ডাকা হবে। তাদেরকে এই প্রশ্ন করা হবে যে, এই নবী প্রচার কাজ চালিয়েছিলেন কি?’ তারা বলবেন হ্যাঁ।’ তখন তাদেরকে বলা হবেঃ ‘তোমরা কি করে জানলে?’ তারা উত্তর দিবেঃ আমাদের নিকট নবী আগমন করেছিলেন এবং তিনিই আমাদেরকে জানিয়েছিলেন যে, নবীগণ তাঁদের উম্মাতের নিকট প্রচার কাজ চালিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহ্র ﴿وَكَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ اُمَّةً وَّسَطًا﴾ এ কথার ভাবার্থ।’ (মুসনাদে আহমাদ ৩/৫৮)
মুসনাদে আহমাদে আরো একটি হাদীসে রয়েছে যে وسط এর অর্থ হচ্ছে عدلا অর্থাৎ যারা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাফসীর ইবনে মিরদুওয়াই ও মুসনাদ ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমি ও আমার উম্মাত উঁচু টিলার ওপর অবস্থান করবো, সমস্ত মাখলূকের মধ্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবো এবং সকলকেই দেখতে থাকবো। সেই দিন সবাই এই আকাঙ্খা পোষণ করবে যে, যদি তারাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত হতো। যে যে নবীকে তাঁদের গোষ্ঠির লোকেরা অবিশ্বাস করেছিলো, আমরা মহান আল্লাহ্র দরবারে সাক্ষ্য প্রদান করবো যে, এই সব নবী তাঁদের রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
জাবির ইবনে ‘আব্দুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন' বানী মাসলামা গোত্রের একটি লোকের জানাযায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপস্থিত হোন। আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পার্শ্বে ছিলাম। তাদের মধ্যে কোন একটি লোক বলে, হে মহান আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! এই লোকটি খুবই সৎ আল্লাহভীরু পুণ্যবান এবং খাঁটি মুসলমান ছিলো। এভাবে সে তার অত্যন্ত প্রশংসা করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বলেনঃ তুমি একথা কি করে বলছো? লোকটি বলেঃ হে মহান আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! গুপ্ত ব্যাপারতো মহান আল্লাহই জানেন। কিন্তু বাহ্যিক ব্যাপার তার এরূপই ছিলো। মহানবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)বলেনঃ এটা তার জন্য ওয়াজিব হয়ে গেলো। অতঃপর তিনি বানু হারিসার একটি জানাযায় উপস্থিত হন তাঁর সাথে আমিও ছিলাম। তাঁদের মধ্যে একজন লোক বলে, হে মহান আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! এই লোকটি খুবই মন্দ ছিলো। সে ছিলো খুবই কর্কশ ভাষী এবং মন্দ চরিত্রের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)তার দুর্নাম শুনে বলেন , তুমি কিভাবে একথা বলছো? সেই লোকটিও ঐ কথা বলে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তার জন্য এটা ওয়াজিব হয়ে গেলো।
মুস‘আব বিন সাবিত (রহঃ) বলেনঃ এই হাদীসটি শুনে মুহাম্মাদ বিন কা‘ব (রহঃ) আমাদেরকে বলেন, মহান আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্যই বলেছেন। অতঃপর তিনি وكذلك. جعلنكم امة وسطا এ আয়াতটি পাঠ করেন।
‘মুসনাদে আহমাদ’ হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, আবুল ‘আলিয়া আসওয়াদ (রহঃ) বলেনঃ ‘আমি একবার মদীনায় আগমন করি। এখানে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বহু লোক মারা যেতে থাকে। আমি ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা যেতে থাকে। জনগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করতে আরম্ভ করে। ‘উমার (রাঃ) বলেনঃ ‘তার জন্য ওয়াজিব হয়ে গেলো।’ ইতোমধ্যে আর একটি জানাযা বের হয়। লোকেরা তার দূর্নাম করতে শুরু করে।’ ‘উমার (রাঃ) বলেনঃ ‘তার জন্য ওয়াজিব হয়ে গেলো।’ আমি বলিঃ হে আমিরুল মু’মিনীন! কি ওয়াজিব হয়ে গেলো?’ তিনি বলেনঃ ‘আমি ঐ কথাই বললাম যা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন। তিনি বলেছেনঃ ‘চারজন লোক যখন কোন মুসলিমের ভালো কাজের সাক্ষ্য প্রদান করবে, মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।’ আমরা বলিঃ যদি তিন ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়? তিনি বললেনঃ তিনজন হলেও।’ আমরা বললামঃ যদি দুই জনে সাক্ষ্য দেয়?’ তিনি বললেনঃ দুইজন হলেও।’ অতঃপর আমরা আর একজনের ব্যাপারে প্রশ্ন করিনি। (হাদীসটি সহীহ। সহীহুল বুখারী-৩/২৭১/১৩৬৮, মুসনাদ আহমাদ ১/২২/১৩৯, ফাতহুল বারী ৩/২৭১, জামি‘ তিরমিযী ৩/৩৭৩/১০৫৯, সুনান নাসাঈ ৪/৩৫৩/১৯৩৩)
যুহাইর সাকাফী (রাঃ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, পিতা বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছিঃ
"يوشك أن تعلموا خياركم من شراركم" قالوا: بم يا رسول الله؟ قال: بالثناء الحسن والثناء السَّيِّئ، أنتم شهداء الله في الأرض".
অতি সত্বর তোমরা তোমাদের মধ্যে কে ভালো আর কে মন্দ তা জানতে পারবে। সাহাবীগণ বললেন, হে মহান আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তা কিরূপে জানতে পারবো? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, পৃথিবীতে তোমরা ভালো ও মন্দ প্রশংসা দ্বারা মহান আল্লাহ্র সাক্ষীরূপে গণ্য হচ্ছো।
কিবলাহ পরিবর্তনে গভীর বিচক্ষণতা
অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রথম কিবলাহ শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক ছিলো। অর্থাৎ প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ নির্ধারিত করে পরে কা‘বা ঘরকে কিবলাহরূপে নির্ধারণ করা শুধ্ ুএই জন্য ছিলো যে, এর দ্বারা সত্য অনুসারীর পরিচয় পাওয়া যায়। আর তাকেও চেনা যায় যে এর কারণে ধর্ম হতে ফিরে যায়। এটা বাস্তবিকই কঠিন কাজ ছিলো, কিন্তু যাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যানুসারী, যারা বিশ্বাস রাখে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা বলেন তা সত্য, যাদের এ বিশ্বাস আছে যে, মহান আল্লাহ যা চান তাই করেন, তিনি বান্দাদের ওপর যে নির্দেশ দেয়ার ইচ্ছা করেন সে নির্দেশই দিয়ে থাকেন এবং যে নির্দেশ উঠিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন তা উঠিয়ে নেন, তাঁর প্রত্যেক কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ, তাদের জন্য এই নির্দেশ পালন মোটেই কঠিন নয়। তবে যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত তাদের কাছে কোন নতুন নির্দেশ এলেই তো তাদের নতুন ব্যথা জেগে উঠে। কুর’আন মাজীদে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ
﴿وَ اِذَا مَاۤ اُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ فَمِنْهُمْ مَّنْ یَّقُوْلُ اَیُّكُمْ زَادَتْهُ هٰذِهٖۤ اِیْمَانًا١ۚ فَاَمَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا فَزَادَتْهُمْ اِیْمَانًا وَّ هُمْ یَسْتَبْشِرُوْنَ۱۲۴ وَ اَمَّا الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا اِلٰى رِجْسِهِمْ﴾
‘আর যখন কোন সূরাহ্ অবতীর্ণ করা হয় তখন কেউ কেউ বলে, তোমাদের মধ্যে এই সূরাহ্ কার ঈমান বৃদ্ধি করলো? অবশ্যই যে সব লোক ঈমান এনেছে, এই সূরা তাদের ঈমানকে বর্ধিত করেছে এবং তারাই আনন্দ লাভ করছে। কিন্তু যাদের অন্তরসমূহে রোগ রয়েছে, এই সূরা তাদের মধ্যে তাদের কলুষতার সাথে আরো কলুষতা বর্ধিত করেছে, আর তাদের কুফরী অবস্থাই মৃত্যু হয়েছে। (৯ নং সূরা তাওবাহ, আয়াত নং ১২৪-১২৫) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ
﴿ قُلْ هُوَ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا هُدًى وَّ شِفَآءٌ١ؕ وَ الَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ فِیْۤ اٰذَانِهِمْ وَقْرٌ وَّ هُوَ عَلَیْهِمْ عَمًى﴾
‘বলোঃ মু’মিনদের জন্য এটা পথ নির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং কুর’আন হবে তাদের জন্য অন্ধত্ব।’ (৪১ নং সূরা হা-মীম সাজদাহ, আয়াত নং ৪৪)
অন্য স্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿وَ نُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْاٰنِ مَا هُوَ شِفَآءٌ وَّ رَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِیْنَ١ۙ وَ لَا یَزِیْدُ الظّٰلِمِیْنَ اِلَّا خَسَارًا﴾
‘আমি অবতীর্ণ করি কুর’আন, যা বিশ্বাসীদের জন্য সুচিকিৎসা ও দয়া, কিন্তু তা সীমালঙ্ঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।’ (১৭ নং সূরা ইসরাহ, আয়াত নং ৮২)
এটা সুবিদিত যে, যে সমস্ত সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে থেকে কোন দ্বিধা-সন্দেহ ছাড়াই সব আদেশকে পালন করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তাঁরাই ছিলেন অগ্রনায়ক। যেসব মুহাজির ও আনসার প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন তাঁরা উভয় কিবলাহর দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছেন।
ইমাম বুখারী (রহঃ), ইবনে ‘উমার (রাঃ) থেকে সূরা আল বাক্বারার ১৪৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেনঃ লোকেরা যখন ‘কুবা’ মাসজিদে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন তখন এক লোক সেখানে উপস্থিত হয়ে বলতে থাকেনঃ কা‘বাকে কিবলাহ করার আদেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রতি আয়াত নাযিল হয়েছে। অতএব তোমরা কা‘বার দিকে মুখ ফিরাও। তখন তারা সবাই কা‘বামুখী হলেন। (ফাতহুল বারী ৮/২২, সহীহ মুসলিম ১/৩৭৫) ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এ বর্ণনার সাথে আরো যোগ করেন যে, ঐ সময় সাহাবীগণ রুকূ‘ অবস্থায় ছিলেন এবং এ খবর তাদের কানে পৌঁছার পর সাথে সাথে ঐ রুকূ‘ অবস্থায়ই তারা কিবলাহ পরিবর্তন করে কা‘বামুখী হোন। (জামি‘ তিরমিযী ৮/৩০০) ইমাম মুসলিম (রহঃ) এ বর্ণনাটি আনাস (রাঃ) থেকে লিপিবদ্ধ করেছেন। (১/৩৭৫) এ বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রতি গভীর আনুগত্য এবং তাঁদের প্রতিটি আদেশ পালন করার জন্য তারা ছিলেন অত্যন্ত তৎপর। মহান আল্লাহ তাদের প্রতি রাযী খুশি থাকুন।
বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ নির্ধারণ করে সালাত সম্পাদন কারীর হুকম
অতঃপর মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَا كَانَ اللّٰهُ لِیُضِیْعَ اِیْمَانَكُم ÔAvi মহান আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের বিশ্বাস বিনষ্ট করবেন।’ অর্থাৎ ইতোপূর্বে তোমরা যে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করছো সেই জন্য তোমাদের ঐ ‘আমল বিফলে যাবে না। আবূ ইসহাক আস শা‘বী (রহঃ) বারা’ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ লোকেরা জানতে চাইলেন, ইর্তোপূর্বে যারা বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ করে সালাত আদায় করেছেন এবং কা‘বাকে কিবলাহ করে সালাত আদায় করার আদেশ প্রাপ্তির পূর্বেই মারা গেছেন তাদের ফায়সালা কি হবে?
তখন মহান আল্লাহ তাদেরকে জানিয়ে দেন, ﴿وَ مَا كَانَ اللّٰهُ لِیُضِیْعَ اِیْمَانَكُمْ﴾ ইমাম তিরমিযী (রহঃ) ও ইবনে ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে এটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটিকে সহীহ বলেছেন। (ফাতহুল বারী ৮/২০, জামি‘ তিরমিযী ৮/৩০০)
ওপরে বর্ণিত আয়াত ও হাদীস দ্বারা এটা জানা যাচ্ছে যে, নির্দেশ পাওয়া মাত্রই বিশ্বাসীরা সালাতের মধ্যেই তাঁরা কা‘বার দিকে ফিরে গিয়েছিলো। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা রুকূ‘ অবস্থায় ছিলো এবং এই অবস্থায়ই কা‘বার দিকে ফিরে যান। এ অবস্থা দ্বারা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি তাঁদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ পাচ্ছে।
অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ وَ مَا كَانَ اللّٰهُ لِیُضِیْعَ اِیْمَانَكُمْ ‘মহান আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবে না।’ অর্থাৎ তোমরা বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ করে যে সব সালাত আদায় করেছো, সে সাওয়াব থেকে আমি তোমাদের বঞ্চিত করবো না। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বরং তাঁদের উচ্চ মানের ঈমানদারী সাব্যস্ত হয়েছে। তাঁদেরকে দুই কিবলাহর দিকে মুখ করে সালাত আদায় করার সাওয়াব দেয়া হবে। এর ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এবং তাঁর সাথে তোমাদের কিবলাহর দিকে মুখ করে ঘুরে যাওয়াকে নষ্ট করবেন না।
এরপর বলা হয়েছেঃ ا اِنَّ اللّٰهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوْفٌ رَّحِیْمٌÔ wbðqB মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু।’ সহীহ হাদীসে রয়েছে, একজন কয়েদী মহিলার শিশু সন্তান তার থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। ঐ মহিলাটিকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখেন যে, সে উন্মাদিনীর মতো শিশুকে খুঁজতে রয়েছে। তাকে খুঁজে না পেয়ে সে বন্দিদের মধ্যে যে শিশুকেই দেখতে পায় তাকেই জড়িয়ে ধরছে। অবশেষে সে তার শিশুকে পেয়ে যায়। ফলে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং লাফিয়ে গিয়ে তাকে কোলে উঠিয়ে নেয়। অতঃপর তাকে বুকে জড়িয়ে আদর সোহাগ করতে থাকে এবং মুখে দুধ দেয়। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণকে বললেনঃ
"أترون هذه طارحة ولدها في النار، وهي تقدر على ألا تطرحه؟" قالوا: لا يا رسول الله. قال: "فوالله، لله أرحم بعباده من هذه بولدها"
‘আচ্ছা বলতো এ্ই মহিলাটি কি তার এই শিশুকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে? তাঁরা বলেনঃ ‘হে মহান আল্লাহ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! কখনোই না।’ তিনি তখন বললেনঃ মহান আল্লাহ্র শপথ! এই মা তার শিশুর ওপর যতোটা স্নেহশীল, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর এর চেয়েও বহুগুণ বেশি স্নেহশীল ও দয়ালু।’ (হাদীসটি সহীহ। সহীহুল বুখারী-১০/৪৪০/৫৯৯৯, সহীহ মুসলিম- ৪/২২/২১০৯)
Social Share
Share With Social Media
Or Copy Link
Be our beacon of hope! Your regular support fuels our mission to share Quranic wisdom. Donate monthly; be the change we need!
Be our beacon of hope! Your regular support fuels our mission to share Quranic wisdom. Donate monthly; be the change we need!
Are You Sure you want to Delete Pin
“” ?
Add to Collection
Bookmark
Pins
Social Share
Share With Social Media
Or Copy Link
Audio Settings